1. md.sabbir073@gmail.com : amicritas :
স্বামীর মৃত্যুশোক না কাটতেই দখল বহুতল বাড়ি-শপিং মল - Metrolife.press
শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ১২:০৯ পূর্বাহ্ন

স্বামীর মৃত্যুশোক না কাটতেই দখল বহুতল বাড়ি-শপিং মল

ইমন রহমান
  • Update Time : শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ১১ Time View

রাজধানীর হাজারীবাগের বাসিন্দা সাবিনা ইয়াসমিন সুইটি (৩৩)। সাত মাস বয়সী একমাত্র সন্তান আয়েশা মণিকে নিয়ে প্রয়াত স্বামী আব্দুল মান্নানের (৪২) বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে অনেকটা বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। স্বামী কোটি কোটি টাকার সম্পদ রেখে গেলেও এখন একমাত্র মেয়ের দুধ কেনার টাকাটা জোগাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে সাবিনাকে। তার ও তার শিশু মেয়ের ‘অপরাধ’ মৃত্যুর আগে আব্দুল মান্নান তার অঢেল সম্পদের মধ্যে হাজারীবাগের ওই সাততলা বাড়িটি একমাত্র সন্তান আয়েশা মণিকে দিয়ে গেছেন (হেবা দলিল)। অবশ্য সাবিনার শাশুড়ি ও দেবররা সেই দলিল জাল দাবি করে ওই বাড়িসহ মান্নানের বাকি সব সম্পত্তিও কবজায় নিয়েছেন। সম্পত্তি দখলের জন্য মান্নানের একমাত্র মেয়ে আয়েশার জন্ম পরিচয়ও অস্বীকার করছেন তারা।

স্বামী আব্দুল মান্নানের সঙ্গে দীর্ঘদিন কুয়েতে থেকেছেন সাবিনা। এই দম্পতি দেশে আসার পর হঠাৎই গত বছর দুরারোগ্য ক্যানসার শনাক্ত হয় মান্নানের শরীরে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ বছরের পহেলা জুন রাজধানীর ধানম-ির ইবনে সিনা হাসপাতালে মারা যান তিনি। মৃত্যুর আগে দেশে ও কুয়েতে রেখে যান একাধিক বাড়ি ও শপিং মলসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। এতসব সম্পদের মধ্যে মৃত্যুর আগে ঢাকার হাজারীবাগের ‘আকাশ তারা’ নামের একটি বাড়ি লিখে দিয়ে যান একমাত্র সন্তান নাবালিকা আয়েশা মণির নামে। আর এতেই বাধে বিপত্তি। মান্নানের মৃত্যুর শোক না কাটতেই সাততলা ওই বাড়িটিসহ মান্নানের সব সম্পদের দখল নেয় সাবিনার মেজ দেবর শওকত আকবর (৩৯), ছোট দেবর কুয়েতপ্রবাসী মো. রাজু (৩৫) ও শাশুড়ি কাজল রেখা (৬০)। তাদের দাবি, আয়েশা মণি আব্দুল মান্নানের নিজের মেয়ে না। আয়েশার নামে হাজারীবাগের বাড়িটির দলিলও ভুয়া। এ নিয়ে আদালতে মামলাও করেছেন তারা।

এদিকে মান্নানের ওইসব বাড়ি, হোটেল ও শপিং মল থেকে তার ভাই ও মা প্রতি মাসে অন্তত চার লাখ টাকা ভাড়া তুলে নিলেও স্ত্রী সাবিনা টাকার অভাবে শিশু মেয়ের দুধটুকু পর্যন্ত কিনতে পারছেন না। হাজারীবাগের বাড়ি ‘আকাশ তারা’র তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে একপ্রকার অবরুদ্ধ জীবন কাটছে মা-মেয়ের। তাদের বাসায় কোনো আত্মীয়-স্বজনকেও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া দেবর ও শাশুড়ি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন হুমকিধমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ সাবিনার। এমন পরিস্থিতিতে তিনি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত ১০ জুন হাজারীবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। যার নম্বর ৪৯৩।

নিজের চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরতে গিয়ে সাবিনা ইয়াছমিন মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মৃত্যুর আগে আমার স্বামী শুধু বাড়িটি মেয়ের নামে লিখে দিছে। আমাকে বলেছে বাকি জীবনটা যেন মেয়েকে নিয়ে কাটিয়ে দিই। আর যেন বিয়ে না করি। স্বামী মান্নানের লাশ গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের গংগাপুরে দাফন শেষে ঢাকায় ফিরে এসে শিশু সন্তানকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ঢুকতে গেলে বাধা দেয় দেবর ও শাশুড়ি। সাততলা বাড়িটির ১৮টি ফ্ল্যাটই তারা দখল করে নেয়।’

বাড়ির দখল শক্ত করতে পুরনো দারোয়ানকে তাড়িয়ে দিয়ে দেবর ও শাশুড়ি নতুন দারোয়ান নিয়োগ দেয় জানিয়ে সাবিনা বলেন, ‘তাকে দিয়ে ভবনটির সব ফ্ল্যাটের ভাড়া জোর করে তুলে নিচ্ছে দেবর শওকত। দুই ভাড়াটিয়া আমাকে ভাড়া দেওয়ায় তাদের নির্যাতন করে। পরে খালিদ হাসান নামে এক ভাড়াটিয়া তাদের বিরুদ্ধে হাজারীবাগ থানায় জিডি করে। যার নম্বর ৬২৪।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর অন্য সব সম্পত্তিও দখল করে নিয়েছে। কুয়েতের হোটেল সোনারগাঁ ও ব্যবসা দখল নিয়েছে ছোট দেবর রাজু। আমি আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় আকাশ তারা বাড়িটির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে মেয়েকে নিয়ে থাকছি। সেখানে আর কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। হুমকি দিচ্ছে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যাওয়ার। সবসময় নজর রাখছে আমার ওপর। আমি থানায় জিডিও করেছি।’

তার শিশু মেয়ের জীবনও এখন হুমকির মুখে জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাবিনা। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। কাছে টাকাও নেই। মেয়ের জন্য ঠিকমতো দুধও কিনতে পারি না। আমাকে অসহায় পেয়ে একদিকে বাড়িসহ সব দখল নিয়েছে, অন্যদিকে আমার নামে কোর্টে মামলা করেছে। সম্পত্তির লোভে আমার সন্তানের জন্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কোর্টে মামলা করায় স্থানীয় পুলিশও কোনো সহায়তা করছে না। তারা বলেছে, কোর্টের মাধ্যমেই ফয়সালা হবে। কিন্তু এই ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে আমি কী করে মামলা চালাব, কোথায় টাকা পাব। আমার স্বামী তো নগদ কোনো টাকা দিয়ে যায় নাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর সদর থানার গংগাপুর গ্রামের মৃত আব্দুল কাদিরের কুয়েত প্রবাসী ছেলে আব্দুল মান্নানের সঙ্গে ২০০৮ সালে বিয়ে হয় একই থানার রুহুল আমিন হাওলাদারের মেয়ে সাবিনা ইয়াছমিনের। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই সাবিনাকে কুয়েতে নিয়ে যান মান্নান। পরে গত বছরের ডিসেম্বরে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারতের ও বাংলাদেশের হাসপাতালে টানা চিকিৎসা চলে তার। এ বছরের পহেলা জুন মারা যান মান্নান। মান্নান মৃত্যুর আগে ঢাকায় দুটি বাড়ি, লক্ষ্মীপুরে বহুতল মার্কেট ও জমি এবং কুয়েতে পাঁচতারকা হোটেল ও দেশটির সামরিক বাহিনীর ব্যবহারের বিভিন্ন মালামাল বিক্রির প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা রেখে গেছেন। এসব সম্পদের মধ্যে মৃত্যুর আগে এ বছরের ১৯ মে ঢাকার দুটি বাড়ির একটি একমাত্র সন্তান আয়েশা মণির নামে লিখে দেন মান্নান। এ সংক্রান্ত হেবা দলিলটির নম্বর ৩১১৯/২০২১। দানকে মুসলিম আইনে হেবা বলা হয়ে থাকে। কারও কাছ থেকে প্রতিদান বা বিনিময় ছাড়া কোনো কিছু নিঃশর্তে গ্রহণ করাকে দান বলা হয়। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ (টিপিঅ্যাক্ট)-এর ১২২ ধারা অনুসারে সম্পত্তিদাতা কোনো ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করলে এবং গ্রহীতা বা গ্রহীতার পক্ষে কোনো ব্যক্তি ওই সম্পত্তি গ্রহণ করলে তাকে দান বলা হয়। ২০০৫ সালের আগস্ট মাস থেকে হেবা করা সম্পত্তির দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেউ যদি জীবিত থাকা অবস্থায় তার মেয়েদের বা মেয়ের নামে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে চান তাহলে তিনি হেবা দলিল সম্পাদন এবং রেজিস্ট্রি করে তা দিতে পারেন। অন্য উত্তরাধিকাররা এ বিষয়ে কোনো আপত্তি করতে পারবেন না।

আইনে আরও বলা আছে, নাবালক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে সম্পত্তি দান করা যায়, তবে হস্তান্তর করা যাবে না, যত দিন না সে প্রাপ্তবয়স্ক হচ্ছে। এক্ষেত্রে বৈধ অভিভাবককে ওই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে হবে। পরবর্তী সময়ে নাবালক সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে হবে।

মান্নানের মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই শওকত আকবর বাদী হয়ে গত ৩০ জুন আদালতে একটি মামলা করেন। এতে আসামি করা হয় সাবিনা ইয়াছমিন ও তার ৪ স্বজনকে। মামলার এজাহারে শওকত আকবর বলেন, ‘আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে হেবা দলিল করেছে। এছাড়া আব্দুল মান্নান ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় আসামির (সাবিনা) গর্ভে একজন কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন যার নাম আয়েশা মণি। জীবিত অবস্থায় আব্দুল মান্নান এই সন্তানকে অস্বীকৃতি জানান এবং পরিবারের সদস্যরাও তাকে অস্বীকার করে।’

তবে দেশ রূপান্তরের হাতে আসা কিছু অডিও রেকর্ড, ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ঘেঁটে দেখা গেছে, মৃত্যুর আগে মান্নান তার মামা মোহনের সঙ্গে ৯ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের কথোপকথনে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনাও করেন। এছাড়া ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে দেখা যায়, মান্নান তার কন্যাকে কোলে নিয়ে আদর করছেন, খেলা করছেন। এ সময় মান্নানের মা কাজল রেখাও পাশে ছিলেন। কাজল রেখার কোলে শিশু আয়েশা মণির থাকার ছবিও রয়েছে। এছাড়া ইবনে সিনা হাসপাতালের জন্মসনদে দেখা গেছে, গত ১১ মার্চ রাত সাড়ে ৯টায় জন্ম হয় আয়েশা মণির। তার বাবার নামের জায়গায় আব্দুল মান্নান ও মায়ের নাম সাবিনা ইয়াছমিন লেখা।

মান্নানের সব সম্পত্তি দখলের কথা স্বীকার করে মামলার বাদী শওকত আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া দলিল করেছে ভাবি ও তার স্বজনরা। এছাড়া যার নামে বাড়ির দলিল করা হয়েছে সে আমার ভাইয়ের ঔরসজাত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ বিয়ের ১২ বছরেও আমার ভাবির কোনো বাচ্চা হতো না। ভাই যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে তখন কীভাবে বাচ্চা হলো?’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ধানম-ি জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মাসুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুক্তভোগী নারী সাবিনা ইয়াছমিন নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছেন। আমরা তার সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। নিরাপত্তাজনিত যেকোনো সমস্যা হলে আমাদের জানাতে বলেছি। আমরা জানতে পেরেছি বাড়িটির দলিল ও ওই নারীর সন্তানের জন্মপরিচয় নিয়ে বিজ্ঞ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সাবিনা ইয়াছমিন বাড়িটির একটি ফ্ল্যাটে আছেন। অন্যান্য ফ্ল্যাটের সম্পূর্ণ বা কিছু টাকা ভাড়া পাওয়ার বিষয়ে তিনি নিশ্চয়তা চাচ্ছেন। তবে এটি যেহেতু সিভিল মেটার, সেহেতু এটা নিয়ে আমাদের কাজ করার সুযোগ নেই।’

সূত্র: দেশ রূপান্তর

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *