1. md.sabbir073@gmail.com : amicritas :
সিআরবি পাহাড় রক্ষার আন্দোলন ও নাগরিক দায় - Metrolife.press
শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ০১:৩২ পূর্বাহ্ন

সিআরবি পাহাড় রক্ষার আন্দোলন ও নাগরিক দায়

রাজেকুজ্জামান রতন
  • Update Time : শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ১০ Time View

চট্টগ্রাম মহানগরে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন। নাগরিকরা একটি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণের বিরোধিতা করছেন। শুনতে কি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? নিজের এলাকায় হাসপাতাল কে না চায়? আর এই করোনা দুর্যোগে মানুষ হাড়ে হাড়ে বুঝেছে হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা আর দেখেছে চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতা। তাহলে চট্টগ্রামের মানুষের কী হলো? তারা হাসপাতালের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন কেন? একটি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মানুষ কেন প্রতিবাদ করছেন? এই প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা আন্দোলন করছেন তারা হাসপাতাল চান না এই অপবাদ দেওয়া কিংবা এক কথায় এই আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণটা একটু গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে। যারা আন্দোলন করছেন তারা সবাই চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। চট্টগ্রামের যেকোনো নাগরিক সমস্যায় তারা শুধু বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন না, তারা জনসাধারণের পক্ষে পথে নামেন। এবারও তেমনি এক অভিন্ন দাবিতে তারা আন্দোলনে নেমেছেন। প্রাণ,-প্রকৃতিকে বাণিজ্যিক থাবা থেকে রক্ষা করতে তারা আন্দোলনে নেমেছেন, প্রতিদিন পালিত হচ্ছে নানা ধরনের কর্মসূচি। মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন, প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে।

সিআরবি রক্ষার এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছে যখন প্রকাশ পেয়েছে যে, বাণিজ্যিক হাসপাতাল তৈরির নামে চট্টগ্রামের সিআরবি পাহাড়কে পছন্দ করেছে ইউনাইটেড গ্রুপ আর সরকার তাদের জন্য রেলওয়ের জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছে। পিপিপি বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে তৈরি হবে বাণিজ্যিক হাসপাতাল। এই হাসপাতালে সাধারণ মানুষের সেবা নয়, ধনী মানুষের চিকিৎসা হবে। চট্টগ্রামের জনসংখ্যার বিবেচনায় আরও হাসপাতাল দরকার। এটা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করা হবে না কেন? হাসপাতালের জন্য সিআরবি পাহাড় সংলগ্ন এলাকা বেছে নেওয়া হলো কেন? বেসরকারি ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক হাসপাতালে সাধারণ জনগণ কি চিকিৎসাসেবা পাবে? একদল চিকিৎসা ব্যবসায়ী আর চিকিৎসা-বিলাসীদের জন্য কি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র আর সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে? আওয়ামী লীগ সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ ও হতবাক মানুষের প্রশ্ন, ব্যবসার হাত থেকে কি কিছুই রক্ষা পাবে না? নদী, বন, পাহাড়, সমুদ্র সবই বাণিজ্য আর লুণ্ঠনের থাবায় ক্ষতবিক্ষত। এবার নজর পড়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আঁধার, সৌন্দর্য আর ফুসফুসের মতো স্থান সিআরবির (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) পাহাড়ের ওপর। চট্টগ্রামের কেন্দ্রস্থলে রেলওয়ে স্টেশন, স্টেডিয়াম, লাভ লেইন, টাইগার পাস, বাটালি হিলের মধ্যখানে এক দারুণ সুন্দর জায়গা এই সিআরবি পাহাড়। একে চট্টগ্রাম মহানগরের শ্বাসকেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হয় না মোটেই। ১৮৭২ সালে তৈরি করা বন্দর নগরীর প্রাচীনতম ভবন, ১৮৯৯ সালে তৈরি বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিনের মডেল, পাহাড়ের শীর্ষে হাতির বাংলোর পাশে দাঁড়িয়ে একনজরে পুরো চট্টগ্রাম শহর দেখা, সকালে হাঁটা, বিকেলে ঘুরে বেড়ানো, পহেলা বৈশাখসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান, শত বছরের পুরনো বিশাল বিশাল গাছ দেখে বিস্মিত বা মুগ্ধ হওয়া সব মিলে এই পাহাড় চট্টগ্রামবাসীর প্রশান্তি ও ভালোবাসার স্থান। এক অর্থে একে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সাংস্কৃতিক বলয়। চট্টগ্রামে কেউ নতুন এলে তাকে নিয়ে সিআরবি পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া এক অবধারিত বিষয় চট্টগ্রামবাসীর কাছে।

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, সিআরবি এলাকা জড়িয়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন আর স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে। এর পাশেই আছে হাসপাতাল কলোনি, যা আবদুর রব কলোনি নামে পরিচিত। সেখানে আছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রবসহ ১০ শহীদের কবর। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে বলতে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে বিসর্জন দেওয়ার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বর্তমান সরকার। এখন অতীতের স্মৃতি রক্ষার চেয়ে ভবিষ্যতের ব্যবসা তাদের কাছে অনেক লোভনীয় বিষয়। তাই সংবিধানের ধারাকে উপেক্ষা করতেও তারা দ্বিধা করছে না। সংবিধানের ১৮(ক) ধারা অনুসারে রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবে। সংবিধানের এই ধারা অনুযায়ী সিআরবিতে কোনো ধরনের স্থাপনা সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

জনগণের অসন্তোষ ও আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য এখন নতুন কৌশল অবলম্বন শুরু হয়েছে। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে ইউনাইটেড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা প্রচার করা শুরু করেছে তারা। আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করতে আবেগের ব্যবহার করার এ এক পুরনো কৌশল। প্রথমত হাসপাতাল, দ্বিতীয়ত বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নাম এই দুই বিষয়কে সামনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে কোনো কোনো পক্ষ থেকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বীর কন্যা প্রীতিলতার নামে ছাত্রী হলের নামকরণের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তখনো আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে এ রকম তৎপরতা চালানো হয়েছিল। কিন্তু তখন সেটা ছিল ছাত্রী হলের নামকরণ নিয়ে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি। কিন্তু এখন চিকিৎসা ব্যবসায়ীর মুনাফা অর্জনের কাজে আবেগের ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে। এরই মধ্যে আন্দোলনকে বিভক্ত ও দুর্বল করার জন্যও বিভিন্নমুখী তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরবাসীর প্রশ্ন, রাষ্ট্রের সম্পদ, দেশের ঐতিহ্য, সাধারণ মানুষের শ্বাস নেওয়ার জায়গা সবকিছু কি গৌণ হয়ে যাবে মুনাফা-শিকারিদের কৌশলের কাছে?

পাহাড়-নদী-সাগর মিলে চট্টগ্রাম প্রকৃতির এক অপূর্ব সুন্দর স্থান। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কেউ কেউ বলে উঠবেন একটু সংশোধন করে বলুন। রেল, বন্দরসহ পাহাড়ের জায়গা লুণ্ঠন, দখল ও দূষণে অবস্থা এখন যা দাঁড়িয়েছে, কিছুদিন পর বলতে হবে একসময় খুব সুন্দর জায়গা ছিল। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় চাক্তাই খালের মরণ দশার কারণে জলাবদ্ধতা, পাহাড় কেটে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সৌন্দর্য নষ্ট করার ফলে চট্টগ্রাম এখন যানজট ও জলজটের শহরে পরিণত হয়েছে। সুন্দর কিছু গড়ে উঠে প্রকৃতি আর মানুষের শ্রমে। আর তাকে ভোগদখল করতে চায়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ বানাতে চায় সুবিধাভোগীরা। এ কাজে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে তারা সিদ্ধহস্ত। অতীতের ধারাবাহিকতায় সিআরবি পাহাড় এখন তাদের সর্বশেষ টার্গেট। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে পাঁচতারা হোটেলের মতো হাসপাতাল হবে, সুদৃশ্য ভবনের মেডিকেল কলেজ হবে। সেখানে চিকিৎসা নেবেন এবং ছেলেমেয়েদের পড়াবেন যাদের অঢেল টাকা আছে। যদিও তাদের টাকা আসবে জনগণকে শোষণ করে বা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেই। আর পরিবেশ ধ্বংস ও সম্পদ লুণ্ঠনের দায় ভোগ করবে জনগণ। তারা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে জনগণের সম্পত্তি পাহাড় কীভাবে ধনশালী আর ক্ষমতাশালীদের কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে।

আন্দোলনকারীরা তাই বলছেন, যদি কেউ হাসপাতাল নির্মাণ করতে চান, তাহলে তো জায়গা অনেক আছে। সিআরবির সবুজ কিংবা বসতি ধ্বংস করে কেন? টাকা থাকলে হাসপাতাল অনেক বানানো যাবে, কিন্তু টাকা থাকলেই দ্বিতীয় সিআরবি পাহাড় কি বানানো যাবে? ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামান্য ক্ষতি কবিতাটি নীতিনির্ধারকদের অনেকেই পড়েছেন। মাঘ মাসের শীত খুব তীব্র কিন্তু শীতের হাত থেকে বাঁচতে দরিদ্র মানুষের কুটিরে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোহানো অন্যায় এবং অমানবিক। তাই রানীকে শাস্তি পেতে হয়েছিল। ছোটবেলায় পড়া এই কবিতার মর্মার্থ কি আমরা উপলব্ধি করতে শিখব না, নাকি পাঠ্যপুস্তকের এই কবিতা শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য পড়া হিসেবে বিবেচিত হবে? একদল মানুষের মুনাফা অর্জন, প্রজেক্ট দেখিয়ে ব্যাংকঋণ গ্রহণ, কিছু মানুষের চিকিৎসা বিলাসিতার জন্য সাধারণ মানুষের সম্পদ কেড়ে নেওয়া হবে? একবার কি ভাববেন না, সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য জায়গা কোথায়? ছেলেমেয়েরা মুক্ত পরিবেশে ছোটাছুটি করবে এমন খোলা জায়গা কোথায়? ৬০ লাখ অধিবাসীর চট্টগ্রাম মহানগরে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জায়গা দিন দিন কমে আসছে। যারা নগরটিকে নিজেদের প্রিয় আবাসভূমি মনে করেন তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন আগে চট্টগ্রাম ছিল এক সবুজে ঘেরা শহর। সেই সবুজ যেন দিন দিন বিতাড়িত হচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে। সুন্দর পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ কেউ তৈরি করেনি। প্রাকৃতিক নিয়মে তা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ প্রাকৃতিকে সাজিয়ে রাখবে না কি সংহার করবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। যোগাযোগের সুব্যবস্থা আর খোলামেলা পরিবেশে হাসপাতাল চিকিৎসা ব্যবসায়ীদের জন্য লোভনীয় কিন্তু তাদের লোভ ও লাভের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাধারণের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া অন্যায় ও অমানবিক, এই বোধ কি জাগবে না?

প্রকৃতি, পরিবেশ ও ঐতিহ্য ধ্বংসের সর্বনাশা প্রক্রিয়া বন্ধ করতে চট্টগ্রামে যারা পথে নেমেছেন, তারা তাদের কর্তব্যের কথা সুস্পষ্টভাবেই বলছেন। তারা হাসপাতালের বিরুদ্ধে নন, তারা প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে চান। তারা সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ সবই চান কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংসের বিনিময়ে নয়। যখন থেকে আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে তখন থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক দেশের জনগণ। এ কথা আমদের সংবিধানেও উল্লেখ আছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রাকৃতিক সম্পদকে সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু যদি মুনাফা-শিকারিদের হাতে সম্পদ ও ঐতিহ্য তুলে দেওয়া হয় তখন সেই অপচেষ্টা রুখে না দাঁড়ালে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ তৈরি হবে কীভাবে? ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায় থেকেই সিআরবি পাহাড় ও তার সৌন্দর্যকে রক্ষা করতে হবে।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com
সূত্র: দেশ রূপান্তর

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *